বঙ্গবন্ধুর খুনি মাজেদের ফাঁসি কার্যকর

    445
    0
    SHARE
    বঙ্গবন্ধুর খুনি মাজেদের ফাঁসি

    বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মস্বীকৃত খুনি ক্যাপ্টেন আব্দুল মাজেদের (বরখাস্ত) ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ৪৫ বছর পর আবারো দায়মুক্ত হলো দেশ। রোববার রাত ১২টা ১ মিনিটে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় বলে কেরানীগঞ্জে কেন্দ্রীয় কারাগারের একটি দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছেন।

    এ সময় ঢাকার জেলা প্রশাসক, সিভিল সার্জন, কারা অধিদফতর ও কেন্ত্রীয় কারাগারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। রাত পৌনে একটার দিকে পুলিশ পাহারায় মাজেদের লাশ অ্যাম্বুলেন্স যোগে কারাগার থেকে বের করে তার গ্রামের বাড়ি ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার বাটামারা গ্রামের উদ্দেশ্যে নেয়া হয়।

    কারা অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক কর্নেল আবরার হোসেন গণমাধ্যমের কাছে বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে ও কারাবিধি অনুযায়ী আব্দুল মাজেদকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরা করা হয়েছে। পরে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দণ্ডপ্রাপ্ততের লাশ দাফনের জন্য তার গ্রামের বাড়িতে পাঠানো হয়েছে। আর কেরানীগঞ্জের নতুন কারাগারে এটিই প্রথম ফাঁসি।

    কারা অধিদফতরের এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, রোববার রাত ১২টার ২০ মিনিটে পর স্ত্রী মাজেদা বেগমসহ কয়েকজন স্বজন কারাগেটে আসেন। প্রক্রিয়া শেষে মাজেদের লাশ তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

    কারা সূত্র জানায়, এর আগে শুক্রবার বিকেলেই কেরানীগঞ্জের কেন্দ্রীয় কারাগারের ফাঁসির মঞ্চ প্রস্তুত করে কারা কর্তৃপক্ষ। শেষ প্রস্তুতির অংশ হিসেবে শনিবার দুুপুরে ফাঁসির মহড়া দেন জল্লাদরা। অতিরিক্ত পুলিশ ও র‌্যাব মোতায়েন করে সন্ধ্যার পর কারাগারের চারদিকের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। রাত আটটার দিকে ফাঁসির মঞ্চের চারপাশে পাওয়ারফুল হেলোজেন লাইট জ্বালিয়ে দেয়া হয়।

    সূত্র জানায়, বঙ্গবন্ধুর খুনি বরখাস্তকৃত ক্যাপ্টেন আব্দুল মাজেদের ফাঁসি কার্যকর করতে শুক্রবারই গাজীপুর থেকে ঢাকা করাগারের আনা হয় অভিজ্ঞ জল্লাদ শাহজাহানের নেতৃত্বে মনির, আবুল, তরিকুল ও সোহেলসহ ১০ সদস্যের জল্লাদকে। ২০১০ সালে ২৭ জানুয়ারী রাতে বঙ্গবন্ধুর যে পাঁচ খুনির ফাঁসি কার্যকর করা হয়, সেই দায়িত্বও পালন করেন শাহজাহান।

    এদিকে কারা অধিদফতর সূত্র জানায়, শুক্রবার সন্ধ্যায় ক্যাপ্টেন মাজেদের স্ত্রী সালেহা বেগমসহ পাঁচজন স্বজন আসামি মাজেদের সঙ্গে দেখা করে গেছেন। এরপর তাদের প্রস্ততিও তারা সম্পন্ন করে রাখেন।

    কারা সূত্র মতে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের অধিকাংশ সদস্যদের অন্যতম খুনি ক্যাপ্টেন (ররখাস্ত) আব্দুল মাজেদকে গ্রেফতারের পর কেরানগঞ্জের কেন্দ্রী কারাগারের একটি কনডেম সেলে রাখা হয়েছিল। সব ফাঁসি কার্যকরের সকল প্রস্তুতির পর শনিবার রাত সাড়ে ১১টার পর মাজেদকে কনডেম সেলেই তওবা করনা কারা মসজিদের ইমাম।

    পরে পৌনে ১২টার দিকে অভিজ্ঞ শাহজাহান ও মনিরসহ ছয়জন জল্লাদ তাকে ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে আসেন। পরে খুনি মাজেদের হাত-পা বেধে ফেলা হয়। এক জল্লাদ তার মুখে যম টুপি ও আরেকজন তার গলায় ফাঁসির দড়ি পড়িয়ে দেন। রাত ঠিত ১২টা ০১ মিনিট সিনিয়র জেল সুপার মঞ্চের পাশে হাতের রুমাল ফেলে দিলে গিয়ার টেনে মাজেদের ফাঁসি কার্যকর করেন জল্লাদ শাহজাহান। তাকে সহযোগিতার করেন আরো অন্তত ছয়জন জল্লাদ। অন্তত ১০ মিনিট দড়িতে ঝুলিয়ে রাখার পর লাশ নীচে নামানো হয়। পরে কারা চিকিৎসক আসামির আসামির হাত-পায়ের রগ কেটে মৃত্যু নিশ্চিত করেন। এসময় সংশ্লিষ্ট সকল কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

    প্রসঙ্গত, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট রাতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সহপরিবারে নির্মম হত্যাকাণ্ডের জড়িত আত্মস্বীকৃত ও সর্বোচ্চ আদালতে মুত্যদণ্ডপ্রাপ্ত খুনি সৈয়দ ফারুক রহমান, বজলুল হুদা, এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান ও মুহিউদ্দিন আহমেদের ফাঁসির দণ্ড ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে কার্যকর করা হয়।

    ওই রায় কার্যকরের আগেই ২০০২ সালে পলাতক অবস্থায় জিম্বাবুয়েতে মারা যান আরেক ঘাতক আজিজ পাশা। তবে ২০০৯ সালের ১৯ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চুড়ান্ত রায়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল থাকা ১২ খুনির মধ্যে এখনো পাঁচ খুনি বিভিন্ন দেশে পলাতক রয়েছেন। তারা হলেন— খন্দকার আব্দুর রশিদ, নূর চৌধুরী, রাশেদ চৌধুরী, শরিফুল হক ডালিম ও মোসলেহ উদ্দিন।

    গত বুধবার দুপুরে ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক এম হেলাল উদ্দিন চৌধুরী বঙ্গবন্ধুর খুনি ক্যাপ্টেন (বরখাস্ত) আবদুল মাজেদের মৃৃত্যু পরোয়ানা জারি করেন। ওইদিন বিকেলেই লাল সালুতে মোড়ানো সেই মৃত্যু পরোয়ানার ফাইল কারাগারে পৌঁছানো হয়। একই দিন সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধুর খুনি মাজেদ কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করেন। রাষ্ট্রপতি তার প্রাণভিক্ষার আবেদন নাকচ করে দিলে সে ফাইল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালরে মাধ্যমে কারাগারে পৌঁছানো হয়। এরপর থেকেই ৭৫ সালে বঙ্গবন্ধ ও তার পরিবারের এই ঘাতকের ফাঁসি কার্যকরে প্রস্তুতি নিতে থাকে কারা কর্তৃপক্ষ।

    এর আগে গত সোমবার (৬ এপ্রিল) গভীর রাতে মিরপুর সাড়ে ১১ থেকে খুনি আব্দুল মাজেদকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের একটি বিশেষ দল।

    সিটিটিসি সূত্র জানায়, করোনাভাইরাস আতঙ্কে ভারত থেকে গত ২৬ মার্চ ময়মনসিংহের সীমান্ত এলাকা দিয়ে অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন বঙ্গবন্ধুর খুনি ক্যাপ্টেন (বরখাস্ত) আবদুল মাজেদ। এর আগে মৃত্যুদণ্ডাদেশ প্রাপ্ত এই আসামি গত ২৩ বছর ধরে ভারতে পালিয়ে ছিলেন। কলকাতায় মাজেদ নিজেকে আবদুল মজিদ পরিচয় নিয়ে আত্মগোপনে ছিলেন। এর আগে লিবিয়া ও পাকিস্তানে আত্মগোপনে ছিলেন।

    নব্বই দশকের মাঝামাঝি আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে খুনি আবদুল মাজেদ প্রথমে বাংলাদেশ থেকে ভারতে পালিয়ে যান। কিন্তু লিবিয়া ও পাকিস্তানে সুবিধা করতে না পেরে আবারো ভারতে ফিরে আসেন। বিশ্বজুড়ে মহামারিতে রূপ নেয়া প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস আতঙ্কে ভারত থেকে গোপনে সীমান্ত পথে দেশে আসেন এই ঘাতক।

    ফিরে দেখা: ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবার নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পরপরই দায়মুক্তি (ইনডেমনিটি) অধ্যাদেশ জারি করা হয়। ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর দায়মুক্তি আইন বাতিল করে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। ওই বছরের ২ অক্টোবর ধানমন্ডি থানায় বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সহকারী মহিতুল ইসলাম বাদী হয়ে মামলা করেন।

    ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর তৎকালীন ঢাকার দায়রা জজ কাজী গোলাম রসুল ১৫ জনকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়ে রায় দেন। নিম্ন আদালতের এই রায়ের বিরুদ্ধে আসামিদের আপিল ও মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিতকরণের শুনানি শেষে ২০০০ সালের ১৪ ডিসেম্বর হাইকোর্ট দ্বিধাবিভক্ত রায় দেন।

    ২০০১ সালের ৩০ এপ্রিল হাইকোর্টের তৃতীয় বেঞ্চ ১২ আসামির মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রেখে তিনজনকে খালাস দেন। এরপর ১২ আসামির মধ্যে প্রথমে চারজন ও পরে এক আসামি আপিল করেন। কিন্তু এরপর ছয় বছর আপিল শুনানি না হওয়ায় আটকে যায় বিচারপ্রক্রিয়া। দীর্ঘ ছয় বছর পর বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আপিল বিভাগে একজন বিচারপতি নিয়োগ দেয়ার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা মামলাটি আবার গতি পায়।

    ২০০৭ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. তাফাজ্জাল ইসলামের নেতৃত্বাধীন তিন বিচারপতির বেঞ্চ মৃত্যদণ্ডপ্রাপ্ত পাঁচ আসামির লিভ টু আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করেন। আপিলের অনুমতির প্রায় দুই বছর পর ২০০৯ সালের অক্টোবরে শুনানি শুরু হয়।

    ২০০৯ সালের ১৯ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ পাঁচ আসামির আপিল খারিজ করেন। ফলে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের নৃশংসভাবে হত্যার দায়ে হাইকোর্টের দেয়া ১২ খুনির মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল থাকে। এর মধ্য দিয়ে ১৩ বছর ধরে চলা এই মামলার বিচারপ্রক্রিয়া শেষ হলে দায়মুক্ত হয় বাংলাদেশ। ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঁচ খুনির ফাঁসির দণ্ড কার্যকর করা হয়।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here